প্রফেসর মুশফিক আহমেদ চৌধুরী(র):বয়ান-২৬৯
🎤 ২৬৯। হজরত মূসা আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উদাহরণ দিয়ে এক বয়ানে স্যার উল্লেখ করেন: কেউ যদি লাঠিকে সাপ দেখে, তবে সেই লাঠির প্রতি তার কোনো আকাঙ্ক্ষা থাকবে না। আবার যদি সাপকে লাঠি দেখে, তবে সে ঐ সাপকেও ভয় পাবে না। অর্থাৎ, বস্তুর প্রকৃত হাকিকত বা এলম জেনে গেলে (অন্তরের দৃষ্টি খুলে গেলে) তার প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ বদলে যায়।
স্যার বলেন, فَإِذَا هِيَ حَيَّةٌ تَسْعَىٰ — হঠাৎ উনার লাঠি এক চলমান সাপ হয়ে গেল (দ্রুতগামী, ভয়ঙ্কর চঞ্চল এক সাপ)। এই জিনিসটি মূসা আলাইহি ওয়া সাল্লাম— এর জন্য এক বিশেষ এলেম হাসিল করার উসিলা ছিল। ঐ মুহূর্তে উনার উপর আল্লাহ তা'আলার একটি বড় হুকুম আরোপিত হয়েছিল। উনার লাঠি ছিল অতি প্রিয় এবং উপকারী জিনিস। তিনি এর উপর ভর করে দাঁড়াতেন, ছাগলের জন্য পাতা ঝরাতেন এবং আরও অনেক কাজে এটি ব্যবহার করতেন। এটি ছিল তাঁর নির্ভরতার প্রতীক। আল্লাহ পাকের ঐ হুকুমে তিনি এই প্রিয় ও নির্ভরশীল জিনিসটিকে বিনা দ্বিধায় যখন ছেড়ে দিলেন, আল্লাহ তা'আলা তাঁর এই ত্যাগকে কবুল করলেন এবং তাঁকে সবচেয়ে বড় জ্ঞান ও নিয়ামত দান করলেন — যা সাধারণ মানুষের চোখে পড়ে না। সেই জ্ঞান ও নিয়ামত হলো যে সেই জিনিসের হাকিকত (প্রকৃত সত্তা, গাইবের দেখা) উনাকে দেখালেন।
স্যার বলেন, আল্লাহ তা'আলা যেরকম মূসা আলাইহি ওয়া সাল্লাম—এর উপকারী ও ভরসার জিনিস বিসর্জন দেওয়াকে কবুল করে তাঁর চোখের পর্দাকে সরিয়ে দিয়েছিলেন। এ রকম জ্ঞান আল্লাহ তা'আলা অন্যান্য নবীদেরকেও দান করেছিলেন। আল্লাহ তা'আলা ইব্রাহিম আলাইহি ওয়া সাল্লাম—কেও আসমান—জমিনের মালাকুত অর্থাৎ গাইবের জগৎ দেখিয়েছিলেন। وَكَذَٰلِكَ نُرِيٓ إِبْرَٰهِيمَ مَلَكُوتَ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِ وَلِيَكُونَ مِنَ ٱلۡمُوقِنِينَ এভাবে আমি ইব্রাহিমকে আসমান ও জমিনের মালাকুত (রহস্যময় জগৎ) দেখালাম, যেন সে দৃঢ় বিশ্বাসীদের অন্তর্ভুক্ত হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মেরাজে নিয়ে আল্লাহ পাক হাকিকত দেখিয়েছিলেন।
এখানে স্যার ব্যাখ্যা করেন যে, দৃষ্টির অন্ধত্ব এবং অন্তরের অন্ধত্ব — এ দুটি ভিন্ন বিষয়। মানুষ কেবল চোখের দেখায় সীমাবদ্ধ থাকলে প্রকৃত সত্য অনুধাবন করতে পারে না। স্যার বলেছেন যে, আল্লাহ তা'আলা মূসা আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অন্তরের (কলবের) দেখা দেখিয়েছিলেন, যা বাইরের দৃষ্টির আড়ালে থাকা এক ভিন্ন সত্যের জগৎ। যখন আল্লাহ তা'আলা মূসা আলাইহি ওয়া সাল্লাম—কে তাঁর হাতের লাঠি ফেলে দিতে বললেন, তিনি দ্বিধা না করে তা ফেলে দিলেন। আর যখন তিনি তা ফেললেন, তখন লাঠির মধ্যে এমন এক জিনিস দেখলেন যা তিনি পূর্বে কখনো দেখেননি। "فَإِذَا هِيَ حَيَّةٌ تَسْعَىٰ", এক চলমান সাপ। স্যার বলেন, আল্লাহ তা'আলা বড় মেহেরবানী করে আমাদের দ্বীন দান করেছেন। যত বেশি আমরা এই দ্বীনের পথে চলবো, আল্লাহর হুকুমের উপর আমল করবো, এবং প্রিয় জিনিসকে ছাড়তে পারবো (অর্থাৎ আল্লাহর জন্য ত্যাগ স্বীকার করবো), আল্লাহ তা'আলা তত বেশি আমাদের চোখের পর্দাকে হটিয়ে দিবেন, আসবাবের (বস্তুগত উপায়—উপকরণ) হাকিকত আমাদের সামনে খুলে দেবেন, এবং অজানা জিনিস আমাদেরকে জানবার তৌফিক দান করবেন। আর যখন এই শুদ্ধ জ্ঞান (এলেম) আসবে, তখন তাঁর জন্য পথ চলা সহজ হবে। এই জ্ঞান মানুষকে শুধু বাহ্যিক দৃষ্টি থেকে মুক্ত করে না, বরং অভ্যন্তরীণ সত্য ও রহস্য উন্মোচন করে, যা তাকে আল্লাহর পথে অবিচল থাকতে এবং সকল পরিস্থিতিতে দৃঢ় থাকতে সাহায্য করে।
স্যার বলেন, এই এলম লাভের কারণেই হযরত মূসা আলাইহি ওয়া সাল্লাম বনি ইসরাঈলকে নিয়ে যখন সমুদ্র এবং ফেরাউনের বাহিনীর মাঝখানে পড়েছিলেন, তখন তিনি ভয় পাননি। কারণ তিনি সমুদ্রের হাকিকত জানতেন এবং ফেরাউনের বাহিনীর হাকিকতও জানতেন। সামনে সমুদ্র পেছনে ফেরাউনের বাহিনী, যেনো এক জাতাকলে দুই দিক থেকে চাপা খাওয়ার দশা, কিন্তু উনি খুব স্থির, উনি নিশ্চিন্ত, তাঁর অন্তরের দৃষ্টিতে সবকিছু পরিষ্কার ছিল, কোন বিচলিত ছিলেন না।
Comments
Post a Comment
Thanks a lot