অন্তর খালি করে এলেম অর্জন করা-প্রফেসর মুশফিক আহমেদ চৌধুরী (র)

 ২৬২। এক মোযাকারায় স্যার বলেছিলেন—

“তালিবে ইলম যদি তার অন্তরকে আগে খালি না করে, যদি সে মনে করে ‘আমি জানি’, ‘আমি বুঝি আমি কী শিখতে চাই’, তাহলে তার ইলমের আরম্ভই জাহালতের উপর ভিত্তি করে গঠিত। সত্যিকার তালিব তো সে-ই, যে জানে— ‘আমি জানি না’।”


স্যার ব্যাখ্যা করলেন, সূরা বাকারা কীভাবে আল্লাহ তাআলা এলেমের এ পাঠ দিয়েই শুরু করেছেন:

“আলিফ-লাম-মীম। এই সেই কিতাব, এতে কোনো সন্দেহ নেই”


স্যার বলেন, “الٓمّٓ” — এটা দিয়ে আমরা কী বুঝি? কিছুই না। কেউই কিছু বুঝে না। কিন্তু তারপরেই আল্লাহ বলছেন, “لَا رَيْبَ فِيهِ” — এতে কোনো সন্দেহ নেই!


এখানেই এলেমের মৌলিক দর্শন নিহিত— *আমি কিছুই জানি না, কিছুই বুঝি না, কিন্তু যিনি শিক্ষা দিবেন, তার উপর আমার পূর্ণ আস্থা আছে।* কি শিখাবেন, কখন শিখাবেন, কিভাবে শিখাবেন — আমি কিছুই জানি না। আমি শুধু তার দরজায় দাঁড়িয়ে আছি, হাত পেতে আছি।


স্যার তখন প্রসঙ্গ আনলেন, হযরত মূসা আলাইহিস সালাম যখন এলেম হাসিলের উদ্দেশ্যে খিজির আলাইহিস সালাম-এর কাছে গেলেন, তখন কী বলেছিলেন?

“তিনি বললেন, আমি কি আপনার অনুসরণ করতে পারি, যাতে আপনি আমাকে সেই এলেম শেখান, যা আপনাকে শিখানো হয়েছে?”

هَلْ أَتَّبِعُكَ عَلَىٰ أَن تُعَلِّمَنِ مِمَّا عُلِّمْتَ رُشْدًا


স্যার ইঙ্গিত করলেন—

মূসা (আ.) বলেননি, “আপনি যে এলেম অর্জন করেছেন, তা আমাকে দিন”। বরং বলেছেন, “مِمَّا عُلِّمْتَ” — “যা আপনাকে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে”।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— তিনি কোনো নির্দিষ্ট বিষয় চাননি, বলেননি, ‘আমাকে এইটা শিখান’, বরং বললেন, ‘আপনাকে যা দান করা হয়েছে, তা থেকে কিছু আমাকে দিন’।


স্যার বোঝান, এটাই তো সত্যিকারের তালিবের ভাষা— “আমি জানি না আমি কী শিখব, আপনি জানেন।”


স্যার বলেন,

ধরে নেওয়া যাক, মুআয ইবনে জাবাল রাদিআল্লাহু তাআলা আনহু যিনি সাহাবীদের মধ্যে বড় মুফতি হিসেবে পরিচিত, যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে প্রশ্ন করতেন— “তুমি কী শিখতে চাও?”

তিনি কখনো বলতেন না— “আমি ফতোয়া শিখতে চাই” বা “আমি ফিকহ শিখতে চাই”।

বরং তার উত্তর হতো— “আমি জানি না”।


এই আলোচনায় স্যার একটি মৌলিক আদবের দিক তুলে ধরেন। তিনি বলেন—

“যে তালিব ওস্তাদকে বলে— ‘আমাকে হাদীস শিখান’— সে তো ওস্তাদকেই নির্দেশ দিচ্ছে। তাহলে ওস্তাদ কে? আর তালিব কে?

যে নিজেই বলে দেয় ‘আমি কী শিখতে চাই’, সে তো নিজেরাই শিক্ষক হয়ে বসে আছে!

তালিব হবে সে-ই, যে নিজের অন্তর খালি করে, বলে— ‘আপনি যা যথার্থ মনে করেন, তাই আমাকে শিখান।’

তবেই সে শিখবে।”


ইলমের দরজায় প্রবেশ করতে হলে আগে নিজের *”জানি”* দাবিকে ছেড়ে দিতে হয়। *”জানি না”*— এই স্বীকারোক্তি দিয়েই ইলমের যাত্রা শুরু হয়। স্যার স্পষ্ট করেন, যিনি জানেন না, এবং জানেন তিনি জানেন না — তার জন্যই উম্মুক্ত থাকে আল্লাহর হিদায়াতের দরজা।

Comments

Post a Comment

Thanks a lot

Popular posts from this blog

প্রফেসর মুশফিক আহমেদ চৌধুরীর(র)জীবনী

প্রফেসর মুশফিক আহমেদ চৌধুরী(র):বয়ান-২৬৯

হক্কানী ওলামা হযরতদের তাবলীগের কাজে সম্পৃক্ততা-প্রফেসর মুশফিক আহমেদ চৌধুরী(র)