Posts

তওবা ও ইস্তেগফার-প্রফেসর মুশফিক আহমেদ চৌধুরী (র)

 🎤 ​২২৮। এক বয়ানে স্যার তওবা ও ইস্তেগফারের পার্থক্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এক উদাহরণ দেন। স্যার বলেন: একজন মহিলা রান্না করছিলেন। পাশেই তাঁর ছোট্ট সন্তান ছিল। তিনি একটু পানি আনতে বাইরে গেলেন। ফিরে এসে দেখলেন, তাঁর সেই অবুঝ শিশুটি চুলার ভেতরে পড়ে গিয়ে পুড়ে মারা গেছে। এই মর্মান্তিক ঘটনা একজন মায়ের জীবনের সবচেয়ে বড় দুঃখ হয়ে থাকবে। তিনি যতবার ঘটনাটি স্মরণ করবেন, ততবার তাঁর হৃদয়ে অনুশোচনার আগুন জ্বলবে, চোখে পানি আসবে, অন্তর কাঁপবে। স্যার বললেন: এই অন্তরের জ্বালা, এই অশ্রু, এই অনুশোচনা—এটাই ‘ইস্তেগফার’। ইস্তেগফার মানে শুধু মুখে “আস্তাগফিরুল্লাহ” বলা নয়, বরং এমন গভীর অনুতাপ—যা হৃদয় থেকে আসে, যা ভুলের স্মরণে বারবার দগ্ধ করে, কাঁদিয়ে তোলে। স্যার এরপর বলেন: আর ওই নারী যদি এই ঘটনার পর নিজের অন্তরে দৃঢ় সংকল্প করে নেন—“আমি জীবনে আর কখনোই আমার কোনও শিশুকে একা রেখে আগুনের কাছে যাব না”—তাহলে এই সিদ্ধান্ত, এই প্রতিজ্ঞা হলো ‘তওবা’। এই উদাহরণের মাধ্যমে স্যার বুঝিয়েছেন, ইস্তেগফার কেবল মুখের কথা নয়, হৃদয়ের কান্না, যখন অন্তর কাঁদে—তা হয় ইস্তেগফার। আর তওবা কেবল একবারের নয়, বরং একটি পরিবর্ত...

এলেম আল্লাহর বড় নেয়ামত -প্রফেসর মুশফিক আহমেদ চৌধুরী (র)

 🎤 ​২৬৭। স্যার এক বয়ানে বলছিলেন—আল্লাহ তাআলার বড় একটি নিয়ামত মানুষের ওপর হলো তার এলেম। কিন্তু আমরা আজকাল এলেম বলতে যা বুঝি, ওই বাকপটুতা— বক বক করতে পাড়া, বলতে পারা, ব্যাখ্যা করতে পারা, যে যত বকতে পারে, সে তত বড় আলেম! যে যত আলোচনা করতে পারে, তাকে তত বেশি জানে বলে মনে করা হয়। যে যত কথা বলতে পারে, তার এলেমকে তত উচ্চমার্গীয় ভাবা হয়। তার বয়ান বক্তৃতা তাঁকে বাচাল করে তোলে, যেখানেই যায়, সেখানেই সে কথা বলতে চায়, যাতে মানুষ তাকে 'আলেম' মনে করে। যেন কথা না বললে আলেম বলেই গণ্য হবে না। স্যার বলেন এইটাকে দীনের ময়দানে, ইসলামে, এলেম বলা হয় না, এলেম মানে কেবল মুখে বলা নয়, বরং এলেম মনের একটা অবস্থার নাম, অন্তরের এক নিরব গভীর উপলব্ধি, হৃদয়ের একটি বিশেষ অবস্থা। এই প্রসঙ্গে স্যার এক মহামূল্যবান ঘটনা উল্লেখ করেন, যা সাহাবি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু— এর জীবনের এক মুহূর্ত থেকে নেওয়া। তিনি ছিলেন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচাতো ভাই, এবং তরুণ সাহাবিদের মধ্যে অন্যতম, যাঁকে “তর্জুমানুল কুরআন” (কুরআনের ব্যাখ্যাকারী) এবং “হিবরুল উম্মাহ” (উম্মতের পণ্ডিত) বলা হ...

লাঠিকে সাপ দেখা মুসা(আ) -প্রফেসর মুশফিক আহমেদ চৌধুরী (র)

 🎤 ​২৬৯। হজরত মূসা আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উদাহরণ দিয়ে এক বয়ানে স্যার উল্লেখ করেন: কেউ যদি লাঠিকে সাপ দেখে, তবে সেই লাঠির প্রতি তার কোনো আকাঙ্ক্ষা থাকবে না। আবার যদি সাপকে লাঠি দেখে, তবে সে ঐ সাপকেও ভয় পাবে না। অর্থাৎ, বস্তুর প্রকৃত হাকিকত বা এলম জেনে গেলে (অন্তরের দৃষ্টি খুলে গেলে) তার প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ বদলে যায়। স্যার বলেন, فَإِذَا هِيَ حَيَّةٌ تَسْعَىٰ — হঠাৎ উনার লাঠি এক চলমান সাপ হয়ে গেল (দ্রুতগামী, ভয়ঙ্কর চঞ্চল এক সাপ)। এই জিনিসটি মূসা আলাইহি ওয়া সাল্লাম— এর জন্য এক বিশেষ এলেম হাসিল করার উসিলা ছিল। ঐ মুহূর্তে উনার উপর আল্লাহ তা'আলার একটি বড় হুকুম আরোপিত হয়েছিল। উনার লাঠি ছিল অতি প্রিয় এবং উপকারী জিনিস। তিনি এর উপর ভর করে দাঁড়াতেন, ছাগলের জন্য পাতা ঝরাতেন এবং আরও অনেক কাজে এটি ব্যবহার করতেন। এটি ছিল তাঁর নির্ভরতার প্রতীক। আল্লাহ পাকের ঐ হুকুমে তিনি এই প্রিয় ও নির্ভরশীল জিনিসটিকে বিনা দ্বিধায় যখন ছেড়ে দিলেন, আল্লাহ তা'আলা তাঁর এই ত্যাগকে কবুল করলেন এবং তাঁকে সবচেয়ে বড় জ্ঞান ও নিয়ামত দান করলেন — যা সাধারণ মানুষের চোখে পড়ে না। সেই জ্ঞান ও নি...

অন্তর খালি করে এলেম অর্জন করা-প্রফেসর মুশফিক আহমেদ চৌধুরী (র)

 ২৬২। এক মোযাকারায় স্যার বলেছিলেন— “তালিবে ইলম যদি তার অন্তরকে আগে খালি না করে, যদি সে মনে করে ‘আমি জানি’, ‘আমি বুঝি আমি কী শিখতে চাই’, তাহলে তার ইলমের আরম্ভই জাহালতের উপর ভিত্তি করে গঠিত। সত্যিকার তালিব তো সে-ই, যে জানে— ‘আমি জানি না’।” স্যার ব্যাখ্যা করলেন, সূরা বাকারা কীভাবে আল্লাহ তাআলা এলেমের এ পাঠ দিয়েই শুরু করেছেন: “আলিফ-লাম-মীম। এই সেই কিতাব, এতে কোনো সন্দেহ নেই” স্যার বলেন, “الٓمّٓ” — এটা দিয়ে আমরা কী বুঝি? কিছুই না। কেউই কিছু বুঝে না। কিন্তু তারপরেই আল্লাহ বলছেন, “لَا رَيْبَ فِيهِ” — এতে কোনো সন্দেহ নেই! এখানেই এলেমের মৌলিক দর্শন নিহিত— *আমি কিছুই জানি না, কিছুই বুঝি না, কিন্তু যিনি শিক্ষা দিবেন, তার উপর আমার পূর্ণ আস্থা আছে।* কি শিখাবেন, কখন শিখাবেন, কিভাবে শিখাবেন — আমি কিছুই জানি না। আমি শুধু তার দরজায় দাঁড়িয়ে আছি, হাত পেতে আছি। স্যার তখন প্রসঙ্গ আনলেন, হযরত মূসা আলাইহিস সালাম যখন এলেম হাসিলের উদ্দেশ্যে খিজির আলাইহিস সালাম-এর কাছে গেলেন, তখন কী বলেছিলেন? “তিনি বললেন, আমি কি আপনার অনুসরণ করতে পারি, যাতে আপনি আমাকে সেই এলেম শেখান, যা আপনাকে শিখানো হয়েছে?” هَلْ أَتَّ...

সাহাবাদের এলেন আল্লাহর পাকের সাথে গভীর আত্মিক সম্পর্ক-প্রফেসর মুশফিক আহমেদ চৌধুরী (র)

 ২৫৯। স্যার বলতেন, সাহাবাদের জ্ঞান বা 'এলেম' ছিল এক বিশেষ ধরনের উপলব্ধি, যা কেবল তথাকথিত মালুমাত বা পাণ্ডিত্য ছিল না। এটি ছিল আল্লাহ তাআলার সাথে এক গভীর আত্মিক সম্পর্ক, যার মাধ্যমে তাঁরা আল্লাহর ইচ্ছা বুঝতে পারতেন এবং সেই ইচ্ছা পালনে নিজেদের অন্তরে অনাবিল আনন্দ অনুভব করতেন। স্যার একটি সুন্দর উপমার মাধ্যমে এই বিষয়টি পরিষ্কার করেছেন। একজন মা যেমন তার সন্তানের প্রতিটি কান্নাকে আলাদা আলাদাভাবে বুঝতে পারেন, যদিও সন্তানের ভাষা কেবল একটাই – *কান্না*। বাচ্চা জাগতে চাইলেও কাঁদে, ঘুমাতে চাইলেও কাঁদে, ঠান্ডায় কাঁদে, গরমেও কাঁদে, খেতে চাইলেও কাঁদে, এমনকি না খাওয়ার ইচ্ছাও কান্না দিয়েই প্রকাশ করে। প্রতিটি কান্নার সুর এক হলেও একজন মা তার সন্তানের কান্নার ভিন্ন ভিন্ন অর্থ অনুধাবন করতে পারেন। বিভিন্ন হালতে বাচ্চার একই ধরনের কান্নার সুরের ভিন্ন ভিন্ন তফসীর মায়ের কাছে পরিষ্কার। তিনি শুধু সন্তানের প্রয়োজনই বোঝেন না, বরং সেই প্রয়োজন পূরণ করতে পেরে তিনি নিজে আনন্দিত হন। স্যার বলেন, মা যখন বুঝতে পারেন বাচ্চা দুধ খেতে চাইছে তাই কাঁদছে, তখন তিনি তাকে দুধ দেন। এই কাজটি করতে তাঁর মনে কোনো বিরক্তি আসে না...

কিতাবের দক্ষতা ও এলেম ভিন্ন জিনিস-প্রফেসর মুশফিক আহমেদ চৌধুরী (র)

 ২৬১। স্যার বলেন, বর্তমানে কেউ যখন এলেম অর্জনের জন্য কোনো মাদ্রাসায় ভর্তি হতে যায় এবং তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, "আপনি কী শিখতে চান?", তখন যদি সে উত্তর দেয়, "আমি ফিকহ শিখতে চাই", তবে এই কথাতেই বোঝা যায় যে সে প্রকৃতপক্ষে  এলেমের উপযুক্ত নয়। সে আসলে কিছু 'মালুমাত' বা তথ্য অর্জন করতে চায়। স্যার সহজভাবে বুঝিয়ে বলেন, মালুমাতের সঙ্গে এলেমের সম্পর্ক অনেকটা ঘাসের সঙ্গে দুধের সম্পর্কের মতো। ঘাস দুধের উৎস হতে পারে, কিন্তু ঘাস নিজেই দুধ নয়।  ঘাস থেকে দুধ তৈরি হওয়ার প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল এবং এর জন্য বিশেষ যোগ্যতার প্রয়োজন, যা মানুষের জ্ঞানের প্রায় বাইরে। একটি ষাঁড় প্রচুর ঘাস খেলেও এক ফোঁটা দুধও দিতে পারে না। অন্যদিকে, গাভী দুধ দিতে পারে, তবে সব সময় নয়। গাভীর মধ্যে একটি বিশেষ 'হালত' বা 'কাইফিয়ত' থাকা চাই,  গাভীর যদি অভ্যন্তরীণ সেই হালত থাকে, তবেই সে ঘাস থেকে দুধ উৎপন্ন করতে পারে। এই দুধ কোথা থেকে এসেছে? ঘাস থেকে নাকি গাভীর যোগ্যতা থেকে? এই প্রশ্ন রেখে স্যার বলেন, এই দুই বিষয়কে আলাদা করা কঠিন। স্যার উল্লেখ করেন, এখানে ঘাসের চেয়ে গাভীর যোগ্য...

সমস্ত দ্বীন এলেমের অধ্যায়-প্রফেসর মুশফিক আহমেদ চৌধুরী (র)

 ২৬০। স্যার বিভিন্ন বয়ান ও মোজাকারায় প্রসঙ্গক্রমে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই হাদীসটা বলতেন— “আমরা নিরক্ষর উম্মত, লিখিও না, গুনিও (হিসাব করা) না।” “إنا أمة أمية، لا نكتب ولا نحسب” এই প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে স্যার একবার বলেন, আমরা যেসব উপকরণকে বর্তমানে 'এলেম' বলি, সেগুলো সাহাবাদের কাছে তেমনভাবে ছিল না। এর অর্থ এই নয় যে তাঁদের এলেম ছিল না, বরং তাঁদের এলেম ছিল এমন এক গভীর উপলব্ধি, যা প্রচলিত লিখন-পঠনের গণ্ডির ঊর্ধ্বে ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছ থেকে সাহাবায়ে কেরাম যে এলেম অর্জন করেছেন, তার কোনো নির্দিষ্ট নাম, সুরত, সংখ্যা বা সংজ্ঞা ছিল না। সেখানে 'ফিকহ' বা 'হাদিস' নামক পৃথক কোনো বিষয় ছিল না, বরং সমগ্র জীবন ও দ্বীন ছিল তাঁদের এলেমের আধার।